কাঠি আইসক্রিমের জন্মবৃত্তান্ত: শিশুর ভুল থেকে গড়ে ওঠা বিলিয়ন ডলারের শিল্প নিয়ে লড়াই

বারান্দায় বসে গ্লাসে করে সোডা পাউডার আর পানি মিশিয়ে খাচ্ছিল অ্যাপারসন। অবচেতনে একসময় গ্লাসের সোডা-পানি রেখেই ঘরে চলে আসে সে। নাড়ানোর কাঠিটিও গ্লাসে রয়ে গিয়েছিল। রাতে ঠান্ডায় জমে গিয়েছিল মিশ্রণটি, আর সকালে ঘুম থেকে উঠে অ্যাপারসন পেল তার জীবনের প্রথম বরফজমা আইস পপ

কাঠির ওপর এক টুকরো বরফ ঠাণ্ডা মিষ্টান্ন— নাম কাঠি আইসক্রিম। বাজারে চকবার থেকে শুরু করে ললিসহ নানা রঙের, নানা স্বাদের আইসক্রিম মেলে। কিন্তু কখনো কি মনে প্রশ্ন জেগেছে, বাহারি স্বাদের এ আইসক্রিমের জন্ম হয়েছিল কীভাবে?

আইসক্রিমের জন্ম

সালটা ১৯০৫, যুক্তরাষ্ট্রের সানফ্রান্সিসকোর মাত্র ১১ বছরের ফ্র্যাঙ্ক অ্যাপারসনের ভুলে এ আবিষ্কারের সূচনা। সেদিন বারান্দায় বসে গ্লাসে করে সোডা পাউডার আর পানি মিশিয়ে খাচ্ছিল অ্যাপারসন। অবচেতনে একসময় গ্লাসের সোডা-পানি রেখেই ঘরে চলে আসে সে। নাড়ানোর কাঠিটিও গ্লাসে রয়ে গিয়েছিল। রাতে ঠান্ডায় জমে গিয়েছিল মিশ্রণটি, আর সকালে ঘুম থেকে উঠে অ্যাপারসন পেল তার জীবনের প্রথম বরফজমা আইস পপ। কৌতূহলবশত সে এক কামড় দিয়েছিল, আর তাতেই জন্ম নেয় ইতিহাসখ্যাত এক মিষ্টান্ন।

শুরুতে সে এর নাম দেয় ‘এপসিকল’। পাড়ায় এ বরফের গোলা বিক্রি করে উপার্জন করতে শুরু করে ফ্রাঙ্ক। অচিরেই এটি তার পাড়ার বাচ্চাদের প্রিয় খাবারে পরিণত হয়। তবে বাচ্চাদের মুখে ঘুরে ঘুরে এপসিকল পপসিকলে পরিণত হয়। পরবর্তীতে পপসিকলই এর স্থায়ী নাম হয়ে যায়।

বাণিজ্যিক যাত্রা

১৯২০-এর দশকের শুরুতে অ্যাপারসন বুঝতে পারেন, তার এ আবিষ্কার আর স্থানীয় পর্যায়ে সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না। তিনি এটি নিয়ে যান ক্যালিফোর্নিয়ার সান ফ্রান্সিসকোর বিখ্যাত বিনোদনকেন্দ্র নেপচুন বিচে। দর্শনার্থীরা ভিড় জমায় তার ঠাণ্ডা আইস পপের স্টলে, আর সেখান থেকেই শুরু হয় পপসিকলের বাণিজ্যিক যাত্রা।

১৯২৪ সালে অ্যাপারসন তার আবিষ্কারের জন্য পেটেন্ট নেন। শুধু বরফজমা খাবার নয়, ব্যবহৃত কাঠির ধরন সম্পর্কেও এতে বিস্তারিত নির্দেশনা ছিল। অল্প কিছু দিনের মধ্যেই ফ্রাঙ্কের পপসিকল ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। কিন্তু তিনি দীর্ঘদিন এ জনপ্রিয়তার স্বাদ ধরে রাখতে পারেননি।

১৯২০-এর দশকের শেষ দিকে অ্যাপারসন জো লো কোম্পানির কাছে পপসিকলের স্বত্ত্ব বিক্রি করে দেন। নতুন মালিক সংস্থাটি দ্রুতই এটি দেশজুড়ে জনপ্রিয় করে তোলে। মহামন্দার সময় কোম্পানি চালু করে দুই কাঠির পপসিকল। যা মাঝখান থেকে ভেঙে দুইজন ভাগ করে খেতে পারত। দামও ছিল মাত্র পাঁচ সেন্ট। সেসময় এটি শুধু ডেজার্ট নয়, অর্থনৈতিক সান্ত্বনার প্রতীক হয়ে ওঠে।

আইসক্রিম যুদ্ধ: ‘ফ্রোজেন সাকার ওয়ার’

কিন্তু সাফল্যের সঙ্গে এল প্রতিদ্বন্দ্বিতাও। চকোলেট-ডুবানো আইসক্রিম বার তৈরি করে খ্যাতি পাওয়া গুড হিউমার কোম্পানি জো লো’র বিরুদ্ধে কপিরাইট মামলা করে। শুরু হয় আইনি লড়াই, ইতিহাসে এটি ‘দ্য ফ্রোজেন সাকার ওয়ার’ নামে পরিচিত। কয়েক বছর ধরে চলা এই মামলা ১৯৩৩ সালে আপসের মাধ্যমে শেষ হয়। চুক্তি অনুযায়ী, পপসিকল ফলভিত্তিক বরফজমা মিষ্টিতে সীমাবদ্ধ থাকবে, আর গুড হিউমার নিয়ন্ত্রণ করবে দুধ বা ক্রিমভিত্তিক আইসক্রিম পণ্য।

সবচেয়ে মজার বিষয়, এ দ্বন্দ্ব শেষ পর্যন্ত টেকেনি। সময়ের পরিক্রমায় দুই কোম্পানিই পরে একই করপোরেট মালিকানার অধীনে আসে। দুটো প্রতিষ্ঠানই এখন ইউনিলিভার কোম্পানির মালিকানাধীন।

এর পর থেকে পপসিকল কেবল খাবার নয়, এক সাংস্কৃতিক প্রতীকে পরিণত হয়। এক শতাব্দীরও আগে, এক শিশুর অবচেতন ভুল থেকে জন্ম নেয়া পানীয় আজ বিলিয়ন ডলারের বৈশ্বিক শিল্পে পরিণত হয়েছে।

আরও